এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও বাংলাদেশের প্রস্তুতিবিষয়ক সেমিনার

নির্ধারিত সময়ে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চান ব্যবসায়ীরা

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের সব শর্তই বাংলাদেশ পূরণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের সব শর্তই বাংলাদেশ পূরণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। এমনকি বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান ভালো বলেও দাবি করেছেন তিনি। তার মতে, এ অবস্থায় ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণ সম্ভব। তাই সরকারও নির্ধারিত সময়ে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিন বছর সময় না বাড়িয়ে, বরং ঝুঁকি নিয়ে হলেও ব্যবসায়ীদের কাজ করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে এলডিসি তিন বছর পেছানোর জোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এলডিসি উত্তরণে সম্ভাব্য সমস্যা ও সেগুলো সমাধানের একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

গতকাল রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে সংগঠনটি আয়োজিত ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি’ শীর্ষক সেমিনারে সরকার পক্ষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখন শেষ ধাপে। ২০২৬ সাল সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও চ্যালেঞ্জগুলো বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এলডিসি উত্তরণে জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি প্রধান মানদণ্ড পূরণ করেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচকের মানদণ্ড পূরণ করেছে বাংলাদেশ। তবে ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েট হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবে আগামী সরকার। কারণ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হবে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যাবে না।’

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত সরকারের সময় সংকটাপন্ন ছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘একসময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনীতি লাইফ সাপোর্টে ছিল। গত এক বছরে দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে, এখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সরকার নির্ধারিত সময়, অর্থাৎ ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবার জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড সফলভাবে পূরণ করে। এরপর ২০২১ সালে এটি পর্যালোচনা করা হয় এবং আবারো এ মানদণ্ডগুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সফল পর্যালোচনার তিন বছর পর একটি দেশ এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়। সে হিসেবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা ছিল। তবে করোনা মহামারীর কারণে ২০২১ সালে উত্তীর্ণ দেশগুলোকে তিন বছরের বদলে পাঁচ বছর ট্রানজিশন সময় দেয়া হয়। ফলে বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশনের সময় ২০২৪ থেকে পিছিয়ে ২০২৬ সাল নির্ধারিত হয়।’

ঝুঁকিগ্রহণের দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয় বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতকেও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এ ঝুঁকি নিতে হবে। বাংলাদেশ যে পথে হাঁটছে, সেই একই পথ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াও পাড়ি দিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের গণমাধ্যমকে নির্মোহভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি কার্যকর বিতর্কে অংশ নেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।’

প্রেস সচিব উল্লেখ করেন, এলডিসি উত্তরণের পূর্ণ সুবিধা নিতে হলে বাংলাদেশের সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়কেই সম্মিলিতভাবে ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

এদিকে এলডিসি তিন বছর পেছানোর জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের অন্ধকারে রেখে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাচ্ছে সরকার। এ বিষয়ে তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসেনি। এলডিসি উত্তরণ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান আইন অনুযায়ী জিএসপি প্লাস সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘সরকারের সঙ্গে আলোচনার অভাব ও কাস্টমসের সমস্যা নিয়ে রফতানিকারকরা অভিযোগ করেছেন। এলডিসি উত্তরণে সম্ভাব্য সমস্যা, তার সমাধান ও একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি। যা নিয়ে সরকার এখনো পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য নিয়মিত ও বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।’

এলডিসি উত্তরণ বাতিল না করে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘গ্র্যাজুয়েশন হবেই, তবে সময় নির্ধারণে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে বসতে হবে। জ্বালানি সংকট ও কাস্টমস জটিলতা দ্রুত সমাধান না হলে বড় ধাক্কা আসবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আলোচনা অবশ্যই সুনির্দিষ্ট তথ্য, উপাত্ত, বিশ্লেষণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, যেখানে উভয় পক্ষ একসঙ্গে বসে বিদ্যমান তথ্য পর্যালোচনা করবে। কেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আলাদা?’

মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘নেপাল বা লাওসের মতো দেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের চেয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৯৭৮-৭৯ সালে শুরু হওয়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত রফতানিনির্ভর। রফতানি খাতই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, লেনদেন ভারসাম্য বজায় রাখা, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মূলধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান।

আরও